বাংলাদেশে জুয়া নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী কাজের (volunteer work) বাস্তবতা হলো, এটি একটি অত্যন্ত সীমিত এবং আইনগতভাবে জটিল ক্ষেত্র। দেশে পাবলিক গেমিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭ অনুযায়ী জুয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ, যার ফলে সরাসরি জুয়া সংশ্লিষ্ট কোনো সংগঠন বা কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবায় অংশগ্রহণের সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। তবে, জুয়ার ক্ষতিকর প্রভাব যেমন ঋণগ্রস্ততা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও পারিবারিক অশান্তি মোকাবিলায় কাজ করে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে স্বেচ্ছাসেবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এগুলো প্রধানত মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনমূলক কাজের সাথে জড়িত।
বাংলাদেশে জুয়া নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা ও তাদের কার্যক্রমের বিস্তারিত নিচের ছকে দেওয়া হলো:
| প্রতিষ্ঠানের নাম/কার্যক্রমের ধরন | স্বেচ্ছাসেবীর সুযোগের ধরন | কার্যকরী এলাকা | চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা |
|---|---|---|---|
| মানসিক স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও হেল্পলাইন (যেমন: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট) | জুয়া আসক্তি থেকে সৃষ্ট মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য কাউন্সেলিং সাপোর্ট, হেল্পলাইন অপারেটর | ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভাগীয় শহরগুলো | নির্দিষ্টভাবে জুয়া আসক্তির জন্য আলাদা ইউনিটের অভাব; স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য বিশেষায়িত ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন |
| সমাজকল্যাণ পরিষদ বা স্থানীয় এনজিও | জুয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, আয়-বর্ধনমূলক প্রশিক্ষণে সহায়তা | বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রাম ও উপজেলা পর্যায় | প্রকল্পভিত্তিক ও অস্থায়ী কাজ; জুয়াকে প্রাথমিক ইস্যু হিসেবে নেওয়া হয় না |
| অনলাইন প্ল্যাটফর্ম (সচেতনতামূলক ব্লগ, ফোরাম) | ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েশন, জুয়ার ঝুঁকি নিয়ে তথ্য শেয়ার করা | ইন্টারনেটভিত্তিক | অনলাইন বাংলাদেশ জুয়া কার্যক্রমের প্রচারের মধ্য দিয়ে সচেতনতার বার্তা পৌঁছানো কঠিন |
| ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন | স্থানীয় মসজিদ/সমাজকেন্দ্রিক আলোচনা সভার আয়োজন, প্রভাবিত ব্যক্তিদের পরিবারের সাথে কথা বলা | সমগ্র দেশ | প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে অনিয়মিত কার্যক্রম |
স্বেচ্ছাসেবী কাজের পরিসংখ্যানগত দিকটি খুবই স্বল্প। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, আনুমানিক ০.৭% পূর্ণবয়স্ক জনগোষ্ঠী (প্রায় ১০ লাখ মানুষ) কোনো না কোনোভাবে জুয়ার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে, কিন্তু এদের মধ্যে পুনর্বাসন বা কাউন্সেলিং সেবা নেওয়ার হার মাত্র ২-৩%। এর প্রধান কারণ সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক কলঙ্ক। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে গেলে প্রথমে এই কলঙ্ক ভাঙার লড়াইয়ে নামতে হয়।
জুয়া সংশ্লিষ্ট স্বেচ্ছাসেবায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বেসিক জ্ঞান। বাংলাদেশে সাইকোলজি বা কাউন্সেলিংয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারী professionals-এর সংখ্যা কম, তাই স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য সরকারি বা বেসরকারিভাবে আয়োজিত স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণই একমাত্র ভরসা। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকার একটি এনজিও ‘সাইকোসোসিয়াল কাউন্সেলিং ফর গেমিং অ্যাডিকশন’ বিষয়ে ১৫ দিনের একটি সার্টিফিকেট কোর্স চালু করেছে, যেখানে এখন পর্যন্ত ১৪০ জন স্বেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
আইনগত দিকটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। যেহেতু জুয়া অবৈধ, তাই সরাসরি জুয়ার কার্যক্রমে জড়িত কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এর নেতিবাচক ফলাফল প্রশমনে কাজ করাই স্বেচ্ছাসেবীদের একমাত্র আইনসম্মত পথ। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে আপনি যদি কাউন্সেলিং দেন, তাহলে গোপনীয়তা রক্ষা করা আপনার প্রথম দায়িত্ব। আবার, অনলাইনে সচেতনতা তৈরি করতে গিয়ে Accidentally কোনো জুয়া প্ল্যাটফর্মের নাম প্রচার করে ফেলা থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করার সময় স্বেচ্ছাসেবীদের মুখোমুখি হওয়া বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে: পরিবারের অসহযোগিতা (“লোকলজ্জার ভয়ে” সমস্যা লুকানো), আর্থিক সংকটের কারণে জুয়াকে দ্রুত আয়ের উৎস হিসেবে দেখা এবং জুয়ায় আসক্ত ব্যক্তির অস্বীকার করার মনোভাব। একটি কেস স্টাডি হিসেবে, খুলনার একটি উপজেলায় একজন স্বেচ্ছাসেবী ৬ মাস ধরে কাজ করে মাত্র ৫ জন যুবককে পুনর্বাসনে সাহায্য করতে পেরেছিলেন, কারণ স্থানীয় নেতারা এটিকে “অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ” বলে মনে করেছিলেন।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নির্ভর করছে ডিজিটাল লিটারেসি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রসারের ওপর। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটিরও বেশি, এবং অনলাইন গেমিং ও বেটিং-এর দ্রুত বিস্তার নতুন প্রজন্মের মধ্যে জুয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই, স্বেচ্ছাসেবী কাজের ক্ষেত্রও এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হচ্ছে। তরুণদের জন্য এখানে একটি বড় সুযোগ রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন, ইনফোগ্রাফিক ডিজাইন এবং অনলাইন হেল্পলাইন ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে সরাসরি প্রভাবিতদের কাছে পৌঁছানোর।
সরকারি পর্যায়ে কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ না থাকায়, এই সম্পূর্ণ সেক্টরটি বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগের উপরই নির্ভরশীল। একটি সমন্বিত প্রয়াসের অভাবই এখানে প্রধান বাধা। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপ যদি তাদের ডেটা এবং রিসোর্স শেয়ার করতে পারে, তাহলে জুয়ার ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় একটি জাতীয় কৌশলগত কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং আরও বেশি তরুণের এই কাজে আকৃষ্ট হওয়া।